খিদে

 


লেখাঃ চিত্রলেখা দে

অলংকরণঃ দেবাঞ্জলি রায়


পোকাটা টুকটুক করে এগিয়ে যাচ্ছে দোরের ধার বরাবর।ওইটুকু পোকার বেঁচে থাকলেই কার কী লাভ আর মরে গেলেই কার কী ক্ষতি হবে কে জানে! সত্যবালারও যেমন বেঁচে থাকা আর মরে যাওয়ার জন্য কারোরই কোনো কিছু যাবে আসবে না।

সেদিন মেজো বৌয়ের থেকে ভাত চাইতে সে ঝাঁঝিয়ে উঠেছিল, "তিন ছেলে, দুই জামাই, এক নাতিকে খেয়েও পেটের খিদে মেটেনি হারামজাদি? নোলা ছুঁকছুঁক করছে এখনও!"

সকাল হলেই ভাঙা সানকি, একটা গাছের ডাল আর ছেঁড়া চাটাই পেতে কুল গাছের নীচে বসে থাকে সত্যবালা- কেউ যদি একমুঠো ভাত দেয় সেই আশায়।

যেদিন বড় নাতিটা অপঘাতে রেলে কেটে ম'লো, সেদিনও বেলা তিন দুপুরে খিদে পেয়েছিল সত্যবালার। বড় নাতনিটার থেকে একটু মুড়ি চাইতে দূর দূর করে খেদিয়ে দিল।

তবে এখন আর সত্যবালাকে দুটো ভাত চাইতে হয় না। বড় নাতবৌ নিজেই সত্যবালাকে ভাত দেয়। দোরের একদিকে কেরোসিনের কুপিটা জ্বলছে, পুতিটা সত্যবালার কাছে বসে খেলছে। ঘরে খিলখিল হাসির শব্দ! সত্যবালা চুপ করে বসে থাকে। ভিতরে কী হচ্ছে, ও জানে। বড় নাতবৌটার ভরন্ত শরীর কিন্তু খালি পেট। পার্টির ছেলেটা অঙ্গনওয়াড়ির রান্নার কাজ দেবে বলেছে, কিন্তু তার আগে তো নিজের...

পার্টির ছেলেটা জামা গুঁজতে গুঁজতে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।বড়ো নাতবৌ সত্যবালাকে জিজ্ঞেস করে, "আজ একপিস মাংস খাবে ঠাকুমা?"

এতো অনাচার! সত্যবালা মাছ খায়নি বিধবা হওয়ার পর থেকে, আজ মাংস খাবে?

নাতবৌ বলছে, "খেয়ে নাও, কেউ টেরও পাবে না। পেটে ভাত না থাকলে আবার কিসের আচার-অনাচার?"

সত্যবালা মাংস দিয়ে ভাতের গ্রাস মুখে তোলে, ওর চোখের ঘোলাটে ডিমটা চকচকে হয়ে উঠেও আবার মিলিয়ে যায়।আর তার ফাঁকে টিকটিকি এসে পোকাটাকে সাবাড় করে দিয়েছে সকলের অজান্তেই। সত্যবালা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটা!

Comments